রেমিট্যান্স বৃদ্ধির জন্য সরকারের নীতিতে যে স্ট্র্যাটেজিক পরিবর্তন দরকার
ধারণা করা হয় স্থায়ী অভিবাসন রেমিট্যান্স কমিয়ে আনে, কারণ কেউ পরিবার সহ দেশ ছেড়ে গেলে আস্তে আস্তে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে রেমিট্যান্স আর ঘরে আসে না, যেহেতু পাঠানোর মতো কেউ থাকে না। কিন্তু এই তত্ত্ব বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য এড়িয়ে যায়।
Remittance as Belonging: Global migration, Transnationalism, and the Quest for Home গবেষণাগ্রন্থে ড. হাসান মাহমুদ বাংলাদেশের রেমিট্যান্সকে বোঝার জন্য Belonging বা অন্তর্ভুক্তির ধারণাকে সামনে আনেন। তিনি দেখান যে স্রেফ অর্থনৈতিক প্রেরণা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রবাহিত করে না, রেমিট্যান্সের সাথে যুক্ত থাকে নৈতিক ও পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আত্মপরিচয়। এগুলো পরিচালিত হয় সেন্স অফ বিলংগিং (sense of belonging) বা অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি দ্বারা। তার মানে হলো, এই যে পরিবার এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ, এর সূত্র হলো পরিবার এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও উপাদানকে নিজ আত্মপরিচয়ের অংশ ভাবা বা সেগুলোকে আপন করে নেওয়া – যাকে আমরা Belonging বা অন্তর্ভুক্তি বলছি। রেমিট্যান্স এখানে অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে বেশি ‘নৈতিক অর্থনীতি’র অংশ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসীদের জীবনে পরিবর্তন আসে। বিবাহ, সন্তান জন্ম, পেশাগত স্থিতি, নাগরিকত্ব লাভ – এসব পরিবর্তন তাদের অন্তর্ভুক্তির ধরনকে বদলে দেয়। স্থায়ী অভিবাসন কিংবা অস্থায়ী, অন্তর্ভুক্তির উপর নির্ভর করে রেমিট্যান্স কখনো বাড়ে কখনো বা কমে। যেমনঃ নিউক্লিয়ার পরিবারের দিকে ঝুকে যাওয়া, ভাই-বোনের বিয়ে হওয়ায় আর্থিক দায়িত্ব কমে যাওয়া, যৌথ পরিবার দূর্বল হয়ে যাওয়া, পারিবারিক দন্দ্ব, সম্পর্কের পরিবর্তন ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, অনেকে যৌথ পরিবার ছাড়াও সম্প্রসারিত আত্মীয়গোষ্ঠী, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, এমনকি পুরো গ্রামের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে। অভিবাসীরা মসজিদে দান করে, শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য পাঠায়, দেশে যাকাত পাঠায়। আবার দেশে কখনো ফিরে আসার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং শৈশব, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের প্রতি নস্টালজিয়া তাদের বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত রাখে। সুতরাং, রেমিট্যান্স একরৈখিক নয়; এটি বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং বিভিন্ন অর্থবহ প্রেক্ষাপটে ঘটে। স্থায়ী অভিবাসী হলেও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবং বিভিন্ন উদ্দেশ্যে পারিবারিক, সামাজিক বা সাম্প্রদায়িক অন্তর্ভুক্তির প্রভাবে রেমিট্যান্স চালু থাকে।
অতএব, রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে কৌশল হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তি বা belonging বাড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের রেমিট্যান্স নীতি শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনাতেই পড়ে আছে – অনেকটা ওষুধের বদলে তেল মালিশ করার মতো।
Belonging বাড়ানোর যুক্তির ভিত্তিতে কিছু নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থায়ী অভিবাসীদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে; তাদের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে এবং বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে হবে; সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; ডায়াসপোরা এনগেজমেন্টকে সাংস্কৃতিক স্তরে শক্তিশালী করতে হবে; প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দ্বিতীয় প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা – এসব উদ্যোগ নিতে হবে; কমিউনিটিভিত্তিক রেমিট্যান্সকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, সরকার ডায়াসপোরা ফান্ডের মাধ্যমে এ অর্থকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারে; পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।
অভিবাসীরা কেবল “ডলার পাঠানো ব্যক্তি” নন – তারা একটি জটিল সামাজিক সত্তা, যারা পরিবার, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। স্থায়ী অভিবাসীরাও রেমিট্যান্স পাঠান কারণ তারা এখনো বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। এ সংযোগ অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানসিক। তাই রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে এ সংযোগকে শক্তিশালী করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর নীতি।
[দৈনিক যুগান্তরের উপসম্পাদকীয় পাতায় ড. হাসান মাহমুদের লেখা "স্থায়ী অভিবাসীরাও কেন পাঠান রেমিট্যান্স" প্রবন্ধ থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত]
উদ্দেশ্যঃ প্রবাসী/দেশিদের এ সম্পর্কে ধারণা দেয়া, জনমত তৈরি করা, এবং সরকারি নীতিতে এ বিষয়ে আলোচনা তৈরি করা।