

শ্যামা ট্রিলজি - গজেন্দ্রকুমার মিত্র
কলকাতার কাছেই, উপকণ্ঠে এবং পৌষ-ফাগুনের পালা - এই তিনটি উপন্যাস নিয়ে শ্যামা ট্রিলজি। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে কয়েক দশক জুড়ে একটি পরিবারের, বিশেষ করে সেই পরিবারের মেয়েদের জীবন, বিয়ে, সংসার, সন্তান, দারিদ্র্য, সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা সুখ-দুঃখের কাহিনি। রাসমণি দিয়ে শুরু, তারপর তাঁর মেয়ে এবং ক্রমে তাদের সন্তানদের জীবন - একটি পরিবারের গল্পের মধ্যে দিয়েই বদলে যাওয়া সময় এবং সমাজের ছবিটা ধরা পড়ে।
তিনটি বইয়েরই একটা বড় শক্তি চরিত্রায়ন। এত চরিত্র, অথচ প্রত্যেকেই আলাদা। কারও ব্যক্তিত্ব ও সহজাত আভিজাত্য আছে, কেউ ঝগড়ুটে; কেউ কম কথার, হিসেবি ও transactional, কেউ আবার প্রচুর কথা বলে - এবং অনেক সময় বাজে বকে। কেউ সুবিধাবাদী, কেউ জেদি, কেউ দুর্বল, কেউ নিজের মতো করে সৎ।
চরিত্রগুলো প্রায় সকলেই grey - শতভাগ ভালো প্রায় কেউই নয়, যদিও শতভাগ খারাপ মানুষ অবশ্য আছে। আর সম্ভবত সেই কারণেই এত বছর পরেও এদের খুব চেনা লাগে। সময়, পোশাক, সামাজিক নিয়ম বদলেছে; মানুষের স্বভাব খুব বেশি বদলায়নি।
কলকাতার কাছেই
অতি ভালো। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো বই। এই উপন্যাসের জন্যই গজেন্দ্রকুমার মিত্র ১৯৫৯ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। রাসমণি অসাধারণ একটি চরিত্র - পরিবারের কর্ত্রী, ব্যক্তিত্বে একটা সহজাত আভিজাত্য আছে, সঙ্গে প্রবল চারিত্রিক দৃঢ়তা। তাঁর মেয়েরা কেউই ঠিক তাঁর মতো নয়, যদিও উমা হয়তো মায়ের কিছু গুণ পেয়েছে।
বাবা-মা সন্তানের ভালো চেয়েও যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটাও খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তা ছাড়া বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, মেয়েদের অসহায়তা, বিয়ের পরে স্বামীর সংসারে মানিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা - সব মিলিয়ে নারীর জীবন কতখানি তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, তা ক্রমশ সামনে আসে।
আবার সেই সময়েও ক্ষীরোদার মতো মা বা শাশুড়ি ছিলেন, যিনি নিজের সন্তানের ভুলকে ভুল বলতে দ্বিধা করতেন না। রাসমণি আর ক্ষীরোদা - এই দুই মাতৃতান্ত্রিক চরিত্রের মধ্যে আমি আমার দিদিশাশুড়ির অনেকটা ছায়া খুঁজে পেয়েছি। মজার ব্যাপার, এঁদের মতোই আমার দিদিশাশুড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যেও কেউই তাঁদের মায়ের মতো হয়ে ওঠেননি।
আর হ্যাঁ, কোথাও কিছু বেমানান মনে হয় না। আশি বছরের পুরনো উপন্যাস, তারও প্রায় চল্লিশ বছর আগের সময়ের গল্প - অর্থাৎ মোটামুটি ১২০ বছর আগের সমাজ - অথচ আজও আশ্চর্য রকম প্রাসঙ্গিক।
উপকণ্ঠে
এটা পড়তে গিয়ে মনে হল লেখার গ্রাফটা একটু downward sloping। বিশেষ করে ভাষার দিক থেকে - গালাগালি বাড়তে থাকে, প্রায় সবাই কোনো না কোনো কারণে বিরক্ত, হতাশ বা ক্ষুব্ধ।
উপন্যাসটি অনেকটাই শ্যামা-ঘেঁষা, তবে অন্য দুই বোন এবং তাদের জীবনও যথেষ্ট জায়গা পেয়েছে। রাসমণি তত দিনে অনেকটাই spent force, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে বাকিরা যেন কিছুটা ম্লান। উপস্থিতি কমলেও তিনি এখনও towering personality।
কষ্ট এই বইতেও একটি নিরবচ্ছিন্ন theme। আর সেই কষ্টের মধ্যে দিয়ে শ্যামার ব্যক্তিত্ব যেভাবে বদলে যেতে থাকে, সেটা খুব স্পষ্ট। প্রথম বইয়ের শ্যামা আর এই শ্যামা এক মানুষ হয়েও যেন এক মানুষ নয় - জীবন তাকে ক্রমশ অন্যরকম করে তুলেছে।
পৌষ-ফাগুনের পালা
এটা আমার ভালো লাগেনি। দীর্ঘ, repetitive, ভাষাও বেশ খারাপ হয়ে গেছে - এবং অনেক জায়গাতেই অকারণে এত দীর্ঘ বলে মনে হয়েছে। অতিরিক্ত শ্যামা এবং তার ছেলেমেয়ে-ঘেঁষা।
পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল - এই বইটা লেখার উদ্দেশ্য ঠিক কী? শুধুই কি শ্যামার সম্পূর্ণ character arc দেখানো? যদি তাই হয়, আমার কাছে তার জন্য এতটা বিস্তারের প্রয়োজন ছিল না।
দুঃখ-কষ্ট trilogy জুড়েই আছে, কিন্তু এখানে তার পরিমাণ এতটাই বেশি যে একটা সময়ের পর আর সহানুভূতি জাগায় না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিই জাগায়। একটার পর একটা দুর্ভাগ্য আসতে থাকলে তার emotional impact-ও ক্রমশ কমে যায়।