u/Ok-Mathematician4536

Image 1 — শ্যামা ট্রিলজি - গজেন্দ্রকুমার মিত্র
Image 2 — শ্যামা ট্রিলজি - গজেন্দ্রকুমার মিত্র

শ্যামা ট্রিলজি - গজেন্দ্রকুমার মিত্র

কলকাতার কাছেই, উপকণ্ঠে এবং পৌষ-ফাগুনের পালা - এই তিনটি উপন্যাস নিয়ে শ্যামা ট্রিলজি। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে কয়েক দশক জুড়ে একটি পরিবারের, বিশেষ করে সেই পরিবারের মেয়েদের জীবন, বিয়ে, সংসার, সন্তান, দারিদ্র্য, সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা সুখ-দুঃখের কাহিনি। রাসমণি দিয়ে শুরু, তারপর তাঁর মেয়ে এবং ক্রমে তাদের সন্তানদের জীবন - একটি পরিবারের গল্পের মধ্যে দিয়েই বদলে যাওয়া সময় এবং সমাজের ছবিটা ধরা পড়ে।

তিনটি বইয়েরই একটা বড় শক্তি চরিত্রায়ন। এত চরিত্র, অথচ প্রত্যেকেই আলাদা। কারও ব্যক্তিত্ব ও সহজাত আভিজাত্য আছে, কেউ ঝগড়ুটে; কেউ কম কথার, হিসেবি ও transactional, কেউ আবার প্রচুর কথা বলে - এবং অনেক সময় বাজে বকে। কেউ সুবিধাবাদী, কেউ জেদি, কেউ দুর্বল, কেউ নিজের মতো করে সৎ।

চরিত্রগুলো প্রায় সকলেই grey - শতভাগ ভালো প্রায় কেউই নয়, যদিও শতভাগ খারাপ মানুষ অবশ্য আছে। আর সম্ভবত সেই কারণেই এত বছর পরেও এদের খুব চেনা লাগে। সময়, পোশাক, সামাজিক নিয়ম বদলেছে; মানুষের স্বভাব খুব বেশি বদলায়নি।

কলকাতার কাছেই

অতি ভালো। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো বই। এই উপন্যাসের জন্যই গজেন্দ্রকুমার মিত্র ১৯৫৯ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। রাসমণি অসাধারণ একটি চরিত্র - পরিবারের কর্ত্রী, ব্যক্তিত্বে একটা সহজাত আভিজাত্য আছে, সঙ্গে প্রবল চারিত্রিক দৃঢ়তা। তাঁর মেয়েরা কেউই ঠিক তাঁর মতো নয়, যদিও উমা হয়তো মায়ের কিছু গুণ পেয়েছে।

বাবা-মা সন্তানের ভালো চেয়েও যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটাও খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তা ছাড়া বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, মেয়েদের অসহায়তা, বিয়ের পরে স্বামীর সংসারে মানিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা - সব মিলিয়ে নারীর জীবন কতখানি তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, তা ক্রমশ সামনে আসে।

আবার সেই সময়েও ক্ষীরোদার মতো মা বা শাশুড়ি ছিলেন, যিনি নিজের সন্তানের ভুলকে ভুল বলতে দ্বিধা করতেন না। রাসমণি আর ক্ষীরোদা - এই দুই মাতৃতান্ত্রিক চরিত্রের মধ্যে আমি আমার দিদিশাশুড়ির অনেকটা ছায়া খুঁজে পেয়েছি। মজার ব্যাপার, এঁদের মতোই আমার দিদিশাশুড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যেও কেউই তাঁদের মায়ের মতো হয়ে ওঠেননি।

আর হ্যাঁ, কোথাও কিছু বেমানান মনে হয় না। আশি বছরের পুরনো উপন্যাস, তারও প্রায় চল্লিশ বছর আগের সময়ের গল্প - অর্থাৎ মোটামুটি ১২০ বছর আগের সমাজ - অথচ আজও আশ্চর্য রকম প্রাসঙ্গিক।

উপকণ্ঠে

এটা পড়তে গিয়ে মনে হল লেখার গ্রাফটা একটু downward sloping। বিশেষ করে ভাষার দিক থেকে - গালাগালি বাড়তে থাকে, প্রায় সবাই কোনো না কোনো কারণে বিরক্ত, হতাশ বা ক্ষুব্ধ।

উপন্যাসটি অনেকটাই শ্যামা-ঘেঁষা, তবে অন্য দুই বোন এবং তাদের জীবনও যথেষ্ট জায়গা পেয়েছে। রাসমণি তত দিনে অনেকটাই spent force, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে বাকিরা যেন কিছুটা ম্লান। উপস্থিতি কমলেও তিনি এখনও towering personality।

কষ্ট এই বইতেও একটি নিরবচ্ছিন্ন theme। আর সেই কষ্টের মধ্যে দিয়ে শ্যামার ব্যক্তিত্ব যেভাবে বদলে যেতে থাকে, সেটা খুব স্পষ্ট। প্রথম বইয়ের শ্যামা আর এই শ্যামা এক মানুষ হয়েও যেন এক মানুষ নয় - জীবন তাকে ক্রমশ অন্যরকম করে তুলেছে।

পৌষ-ফাগুনের পালা

এটা আমার ভালো লাগেনি। দীর্ঘ, repetitive, ভাষাও বেশ খারাপ হয়ে গেছে - এবং অনেক জায়গাতেই অকারণে এত দীর্ঘ বলে মনে হয়েছে। অতিরিক্ত শ্যামা এবং তার ছেলেমেয়ে-ঘেঁষা।

পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল - এই বইটা লেখার উদ্দেশ্য ঠিক কী? শুধুই কি শ্যামার সম্পূর্ণ character arc দেখানো? যদি তাই হয়, আমার কাছে তার জন্য এতটা বিস্তারের প্রয়োজন ছিল না।

দুঃখ-কষ্ট trilogy জুড়েই আছে, কিন্তু এখানে তার পরিমাণ এতটাই বেশি যে একটা সময়ের পর আর সহানুভূতি জাগায় না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিই জাগায়। একটার পর একটা দুর্ভাগ্য আসতে থাকলে তার emotional impact-ও ক্রমশ কমে যায়।

u/Ok-Mathematician4536 — 2 days ago

বিমল কর – উপন্যাস সমগ্র (খণ্ড ৩ ও ৫)

সামগ্রিকভাবে উপন্যাসগুলো ধীর গতির, অন্তর্মুখী এবং আবেগের নানা স্তরে গড়ে ওঠা। এগুলো সবই সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের গল্প। চরিত্রগুলো এতটাই সাদামাটা, সংযত আর বাস্তব যে, প্রথমে মনে হতে পারে - এদের নিয়ে আবার উপন্যাস লেখা যায় নাকি! অথচ ঠিক সেখানেই বিমল করের মুন্সিয়ানা। অসাধারণ কোনো ঘটনা নয়, বরং নিতান্ত সাধারণ মানুষের ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, টানাপোড়েন আর সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনই তাঁর লেখার মূল আকর্ষণ। খুব সম্ভব, এই দুই খণ্ডের কোনো না কোনো গল্পে, কোনো একটি চরিত্রে বা কোনো এক পরিস্থিতিতে পাঠক নিজেরই প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন।

যেগুলো আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে

কেরানীপাড়ার কাব্য
এই উপন্যাসের নায়ক কোনো মানুষ নয়, একটি রেল কলোনি। কলোনিটির যেন নিজস্ব প্রাণ আছে, নিজস্ব শ্বাস-প্রশ্বাস আছে। সেখানে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, ঝুপড়িবস্তির মানুষ - সবাই মিলে তৈরি করেছে কলোনির নিজস্ব ব্যক্তিত্ব। নির্দিষ্ট কোনো প্লট নেই। বরং একে একটি কলোনির জীবনী বললেই বেশি মানায়।

এ আবরণ
একটি তরুণীর আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি আবর্তিত। তার মৃত্যুর পর আশপাশের মানুষজন নিজেদের অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা, ক্ষোভ আর পূর্বধারণা থেকে আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে থাকে। প্রত্যেকের কাছেই মেয়েটির আলাদা পরিচয়। কোথাও কোথাও বাদল সরকারের পাগলা ঘোড়া নাটকের কথা মনে পড়েছিল, যদিও মিলটা খুবই সামান্য। শেষ পর্যন্ত মেয়েটির নিজের দৃষ্টিভঙ্গিই সামনে আসে, আর বোঝা যায় কেন তার কাছে আত্মহত্যাই একমাত্র পথ বলে মনে হয়েছিল।

অসময়
১৯৭৫ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস। সে অর্থে কোনো চমকপ্রদ প্লট নয়, বরং আমার-আপনার-আমাদের অনেকেরই গল্প। জ্যাঠামশাইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বনেদি পরিবারের ভাঙন, একাকীত্ব এবং মধ্যবিত্ত আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্টই উপন্যাসটির মূল বিষয়। মোহিনী, আয়না, সুহাস আর শচীপতি - প্রত্যেকেই নিজের সীমাবদ্ধতা আর বাস্তবতার মধ্যে আটকে থেকে জীবন চালিয়ে যাচ্ছে।

এই একঘেয়ে জীবনে পরিবর্তন আসে সুহাসের বন্ধু অবিনের আগমনে। তার চিন্তাভাবনা আর যুক্তি পুরো পরিবেশটাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। উপন্যাসটির আরেকটি বড় শক্তি হল, প্রতিটি প্রধান চরিত্র নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলেছে। ফলে একই ঘটনাকে বিভিন্ন চোখ দিয়ে দেখা যায়।

সানিধ্য
দীর্ঘদিন স্যানাটোরিয়ামে চিকিৎসার পর এক গৃহবধূ বাড়ি ফিরে আসে। সে পুরোপুরি সুস্থ নয়। শ্বশুরবাড়ির মানুষজন আন্তরিক এবং যথাসাধ্য তার যত্ন নেয়। কিন্তু তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সংসারের সবাই, এমনকি তার স্বামীও, নিজেদের মতো করে জীবনকে গুছিয়ে নিয়েছে। ফিরে এসে সে অনুভব করতে থাকে, যেন তার জায়গাটা আর আগের মতো নেই। সংসারের ছোট ছোট পরিবর্তন, মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম বদল - সব মিলিয়ে তার মনে হয়, তাকে যেন ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই মানসিক টানাপোড়েনই উপন্যাসটির মূল শক্তি।

এক অভিনেতার মৃত্যু
একজন কিংবদন্তি অভিনেতা মৃত্যুশয্যায়। একজন তরুণ সাংবাদিক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। নানা সূত্র ধরে সে পৌঁছে যায় অভিনেতার প্রথম স্ত্রী, এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং শেষ পর্যন্ত অভিনেতার কাছেও। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, যিনি দর্শকদের কাছে মহাতারকা, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ - নিজের মুখেই স্বীকার করেন, তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন না। উপন্যাসটি কোনো বিচার করে না, শুধু একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে - জনপ্রিয়তা আর ব্যক্তিগত চরিত্র এক জিনিস নয়; যাঁদের আমরা পূজা করি, তাঁরা সবসময় সেই সম্মানের যোগ্য নাও হতে পারেন।

নতুন তারা
প্রজন্মের ব্যবধান নিয়ে লেখা এক চিরকালীন গল্প। সন্তানরা যখন প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাবা-মায়েরা সেই সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখেন, সেটাই উপন্যাসটির মূল বিষয়। সময় বদলালেও এই দ্বন্দ্বের খুব একটা পরিবর্তন হয় না। তাই আজও উপন্যাসটি সমান প্রাসঙ্গিক।

যাঁদের আগ্রহ আছে, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে আমার বিস্তারিত মতামত এখানে পড়তে পারেন - https://www.reddit.com/r/Banglasahityo/comments/1t0ptab/%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%A8%E0%A6%AF%E0%A6%B8_%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%97%E0%A6%B0_%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE_%E0%A6%93_%E0%A6%A6%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A6%AF_%E0%A6%96%E0%A6%A3%E0%A6%A1_%E0%A6%AC%E0%A6%AE%E0%A6%B2_%E0%A6%95%E0%A6%B0/

u/Ok-Mathematician4536 — 15 days ago

কিশোর ভৌতিক সমগ্র - হেমেন্দ্রকুমার রায়

মোট ১২টি উপন্যাস, ২টি নাটক এবং ৮২টি ছোটগল্প নিয়ে এই সংকলন। কয়েকটি গল্পে লেখকের জনপ্রিয় অভিযাত্রী চরিত্র জয়ন্ত-মানিক ও বিমল-কুমারেরও দেখা মেলে।

আমার কাছে গল্পগুলো মোটামুটি একবার পড়ার মতোই লেগেছে। আজকের সময়ের বিচারে খুব ভয়ের বা রোমাঞ্চকর বলে মনে হয়নি। তবে এগুলো যে বাংলা ভৌতিক সাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, এই রচনাগুলোর বেশিরভাগই প্রায় সত্তর-আশি বছর আগে লেখা। সেই সময়ের নিরিখে এগুলো নিঃসন্দেহে অসাধারণ।

অনেক গল্পেই পাশ্চাত্যের ক্লাসিক ভৌতিক সাহিত্যের প্রভাব স্পষ্ট। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, ড্রাকুলা-সহ একাধিক গল্পের অনুপ্রেরণা বা রূপান্তরের ছাপ চোখে পড়ে। কয়েকটি বিষয় বারবার ফিরে আসে - মিশরের মমি বা প্রাচীন নিদর্শন নিয়ে গবেষণা, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনায়াসে সেগুলো কিনে ফেলা, কিংবা মৃতকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা।

মহিলা চরিত্রের উপস্থিতি খুবই সীমিত। থাকলেও তারা প্রায় সবসময়ই গৌণ ভূমিকায়। পুরো জগতটাই যেন পুরুষদের দখলে।

সব মিলিয়ে, আমার কাছে এটি একবার পড়ে দেখার মতো সংকলন। তবে না পড়লেও বিশেষ কিছু মিস করবেন বলে মনে হয়নি।

u/Ok-Mathematician4536 — 15 days ago