Justice For Baruipur
অনেকে এখনও জানতে চাইছেন, বারুইপুরে কী হয়েছে? কী অভিযোগ? তাঁদের জন্য সংক্ষেপে পুরোটা লিখে দিই। দয়া করে কপি করে লোকজনকে পাঠান, কারণ মিডিয়ায় তেমন কিছু নেই, ফলে অনেকেই পুরোটা জানেন না।
বারুইপুরে একটি ছোট্টো বছর দশেকের মেয়ে, ধরা যাক তার নাম হাস্নুহানা, হঠাৎই "হারিয়ে" যায়। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, হাস্নুহানার নামে মিসিং কমপ্লেন্ট করার পরেও পুলিশ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি । নানা স্থানীয় চ্যানেলে তাঁরা বলেছেন, যে, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় দেখার পরে স্থানীয় মানুষই সন্ধানের কাজে নেমে পড়েন। প্রথমে সারা রাত খোঁজা হয়। তারপর সকাল হলে, যে কাজ গোয়েন্দার, সেটাই তাঁরা করতে থাকেন। বিভিন্ন দোকানের সিসিটিভি খতিয়ে দেখে মেয়েটির অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়।
অনুসন্ধানের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগোয়। দুপুরের দিকে এক বস্তার মধ্যে ছোট্ট মেয়েটার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় । ধর্ষণ ও খুন করে পুকুরে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। স্থানীয় মানুষ শুধু মৃতদেহ উদ্ধার করেন নয়, সম্ভাব্য অপরাধীদের চিহ্নিত করেন। তাদের জেরা করেন এবং ৪ জন অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। অভিযোগ, এই অনুসন্ধান এবং দেহ উদ্ধারের সময় থানার কোনো পুলিশকর্মীর টিকি দেখা যায়নি। শুধু স্থানীয় ক্যাম্পের এক কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এর পর ঘটনা মারাত্মক দিকে ঘোরে। পুলিশ ওই ৪ জনকেই ছেড়ে দেয়। অভিযোগ, ওই ৪ জন অভিযুক্তই RSS কর্মী। এবং আরও অভিযোগ, যে, স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডল থানায় প্রভাব খাটিয়ে ওই ৪ অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনেন। বলাবাহুল্য, জনরোষ এরপর বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে । পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়, এবং পুলিশের ওপর আস্থা না রেখে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় অভিযুক্তকে।
পুরো ঘটনা সারাদিন ধরে দফায় দফায় ঘটতে থাকলেও, মূলধারার মিডিয়া, যাকে ডিম্মিডিয়া বলা হয়, সন্ধ্যের আগে এক লাইনও সম্প্রচারের সময় পায়নি। সন্ধ্যের পর থেকে যৎসামান্য দেখানো শুরু হয়। রিপাবলিকের ময়ূখরঞ্জন রাত থেকে অবস্থা সামাল দিতে সারারাত ফেসবুকে পোস্ট করতে থাকেন। "বারুইপুরে খরচা হোক", জাতীয় ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা লিখতে থাকেন। "বিজেপি-নেতার কথায় পুলিশ অভিযুক্তদের ছেড়ে দিয়েছে" - এই অভিযোগ নিয়ে একটি বাক্যও বলেননি।
এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হাস্নুহানার বাবাকেই পুলিশের বড় দপ্তর, ভবানীভবনে তলব করেন। আর কালীঘাটে নেমে যায় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যেন কিছুতেই বারুইপুরে পৌঁছতে না পারেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তাঁকে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। প্রসঙ্গত এর কয়েকদিন আগেই গোটা কলকাতার বিরাট অংশ জুড়ে মিটিং-মিছিলে নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে।
পুরো ঘটনা নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য বা অগ্নিমিত্রা পাল, যাঁরা এই জমনার ব্যতিক্রমী 'ভব্য' মুখ বলে পরিচিত, তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লকেট বলেছেন তিনি শোনেনই নি। বাকিরা কোথায় কেউ জানেনা, সম্ভবত ডিম্মিডিয়া তাঁদের বিব্রত করেনি। তবে গভীর রাতে শ্রদ্ধেয়া কাকীম রত্না দেবনাথ একটি ফেসবুক পোস্ট করে জানিয়েছেন, মা-বাবার কোল খালি করল যারা তাদের কড়া শাস্তি পাওয়া উচিত। দলীয় নেতার হস্তক্ষেপেই অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে আনার অভিযোগ নিয়ে তিনি রা কাড়েননি।
এই নিয়ে এখনও কোনো আন্দোলনের ডাক পাওয়া যায়নি। রাত-দখলের কৃতিত্ব নিয়ে যাঁরা কাড়াকাড়ি করছিলেন, তাঁরা মোটের উপর নিশ্চুপ, কিংবা মৃদু সমীরণের মতো বক্তব্য রাখছেন। অভয় মঞ্চের পক্ষ থেকে লাইভ করে সরকারের প্রতি আস্থাজ্ঞাপন করা হয়েছে। সুবিচারের জন্য আবেদন করেছেন শ্রী পুণ্যব্রত গুণ এবং মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে বারণ করেছেন।
সব মিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, বিরোধীদের জন্য বারুইপুর অবরুদ্ধ। কিছু হলেও ডিম্মিডিয়া দেখাবেনা। মোটের উপর ব্ল্যাক আউট চলছে। পোস্ট মর্টেম কী হয়েছে কেউ জানেনা। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, যে বস্তায় দেহ ছিল, সেটা এখনও পড়ে। এভিডেন্স আদৌ সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। এবং ময়ূখের বক্তব্যের পর সন্দেহ হচ্ছে, একমাত্র সাক্ষী বলে যাঁর কথা শোনা যাচ্ছে, তাঁকেই "খরচা" করে দেওয়া হতে পারে। পরপর অনেকগুলো ধর্ষণ বা লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটল নতুন জমানায়। চন্দ্রনাথের খুনের কোনো কিনারা হয়নি। ইভিএম পুড়ে গেল এবং ডিম-ছোঁড়া জাতীয় গণহিংসায় কার্যত উৎসাহ দেওয়া চলছে।
এই হল অবস্থা। এখানে দুটো কথা বলতে পারি। এক, ডিম্মিডিয়ার উপর কোনো আস্থা রাখবেন না। অনেকেই অভ্যাসবশত ওখানেই খবর খোঁজেন, দেখন, অভ্যাস কাটানো সহজ না। কিন্তু অভ্যাসটা ছাড়তে হবে। এমনকি শেয়ার করার অভ্যাসও। পরিবর্তে ছোটো মিডিয়া দেখুন। তাতে অনেক জল থাকে, কিন্তু শুধুই ভূষিমাল থাকেনা। আমি এই খবরগুলো পেলাম জি-আই, বেঙ্গল-নিউজ এবং নিউজ-ওয়ান বলে তিনটে চ্যানেল থেকে। যা যা চ্যানেল দেখি, ইউটিউবে এবং ফেসবুকে, তার একটা তালিকা বানিয়ে একটা পাতা বানাব ঠিক করেছি। আপনারাও যা দেখেন, মন্তব্যে যোগ করতে থাকুন।
আর দুই হল, ডিম্মিডিয়াকে মহিমান্বিত করার কাজটা এখনও বিজেমূল এবং রাম্বামরা করে চলবেন। বিজেমূলরা পরিদৃশ্যমান, রাম্বামরা অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। চিহ্নিত করুন। অন্য কোনো কারণে না, এঁদের কথা আর শুনবেন না বলে।
আন্দোলন কে কবে করবেন, সেসব অ্যাকটিভিস্টরা বলবেন। সাধারণ মানুষ বলবেন। দলগুলো বলবে। কিন্তু এইটুকু আমরাই করতে পারি।
বারুইপুর নাবালিকা ধর্ষণ খুন কান্ড
যতদূর জানা গেছে, অভিযুক্তরা সবাই বিজেপি কর্মী। পুলিশ তাদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করবার পরেও স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মন্ডল গিয়ে নাকি তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। তাই খুব অবভিয়াস কারণেই গোদি মিডিয়ায় এই ঘটনার সম্পর্কে টু শব্দটিও শোনা যাবে না
আমাকে, আপনাকে, সবাইকে মিলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যত বেশি সম্ভব পোস্ট শেয়ার টুইট করে খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে, মানুষজনকে সচেতন করতে হবে।
ডিপ ফ্রায়েড - একটি ছোট গল্প
লেখক: u/byomkeshbeyond
অনুবাদ: অধম স্বয়ং
কলকাতা গলছে। মেটাফোরিক্যালি নয়। লিটারালি। গুগল বলছে তাপমাত্রা ৩৮°C। ফিলস লাইক ৪৮°C। কখনও গরম তার, ভেজা মোজা, পোড়া ডিজেল, সস্তা পারফিউম, পুরোনো শত্রুতা, আর ফ্রায়ারের তেলের গন্ধ শুকেছেন? শহরটা থেকে ঠিক সেই রকমই গন্ধ বেরোচ্ছিল।
এই রোদের ঝলকানিতে তখন পার্ক সার্কাস জ্বলছে। রোদেই জ্বলছিল তখন, এমনি অন্য কারণে জ্বলে। সেই পার্ক সার্কাসের ক্রসিং ছাড়িয়ে বালিগঞ্জের দিকে একটু এগোতেই বাঁ হাতে কোয়েস্ট মল। এবং সেই কোয়েস্ট মলের পাঁচ তলায় কনজিউমারিজমের ফ্লুরোসেন্ট আভায় দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ম্যাকডোনাল্ডস। এটি অবশ্য নতুন খুলেছে (প্লটের খাতিরে), তাই কোয়েস্ট মলের রেগুলাররা আমায় জেলা-বাসী ভেবে রেসিজম করবেন না।
যাক গে, আমাদের গল্প এই ম্যাকডোনাল্ডসেরই জনৈক কর্মী লতিকাকে নিয়ে। সে স্টোরে ঢুকলেই ফুটন্ত তেল, বাসি ময়দা আর লাইসলের গন্ধের মাঝে একটা হালকা ল্যাভেন্ডারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। লতিকা। ল্যাভেন্ডার লতিকা। হুঁ, সে কথা পরে বলব।
দেখে মনে না হলেও, সে কিন্তু তার কাজকে খুব পছন্দ করে। সেদিনও ফ্রায়ারের সামনে দাঁড়িয়েছিল। নজর একদৃষ্টে ফুটন্ত তেলের ভেতর। এক গাদা চিকেন নাগেট সেখানে মারপিট করছে। সোনালি। সম্ভ্রান্ত। সুন্দর। ফুটন্ত তেলের সেই "চকচকচকসসসসসস..." শব্দটা খুব পছন্দের লতিকার। তার মনে হয় সেই তেল যেন তার সঙ্গে কথা বলছে - কতশত গসিপ দিচ্ছে তাকে।
সবাই ভাবে ফ্রাইং হয়তো কুকিং। আহাম্মক সবকটা। ফ্রাইং আসলে ট্রান্সফরমেশন। নরম কিছু আপনি জ্বলন্ত জুলুমের মধ্যে নিক্ষেপ করলেন... এবং তা শক্তপোক্ত হয়ে বীর বিক্রমে বেরিয়ে এল। কিছুক্ষণ পরে লোকমুখে চালান হয়ে যাবে। বেশ কেমন অ্যাডাল্টহুডের মতো, না?
“লতিকা, দুটো ম্যাকস্পাইসি! আর একটা ফিলেট। চল চল, হাত চালা!” ম্যানেজার চিৎকার করে উঠল। ছেলেটির নাম অরিন্দম, কিন্তু কলকাতার মিডল-ক্লাস কালচারের কমিউনিকেশন নোমেনক্লেচারের তাড়নায় পড়ে সবাই তাকে “স্যার” বলত।
লতিকা মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল। এক রাশ ঘন চুল তখন খোঁপা করে বাঁধা। তার ওপর হেয়ারনেট। অ্যাপ্রনে তেলের ছিটে। চোখের তলায় কালি। ঘুম কি ভালো হচ্ছে না তার? ২৫ বছরের লতিকা, যে কিনা বাচ্চাবেলায় ইউরোপের ডেস্টিনেশন শর্টলিস্ট করত, আজ সে বার্গারের অ্যাসেম্বলি সিকোয়েন্স মুখস্থ করে।
পিকল। অনিয়ন। সস। প্যাটি। বান। ডেসপেয়ার। রিপিট।
মলের সুবৃহৎ কাঁচের বেড়াজালের ওপারে ধনী লোকেরা, মাওড়া গুজিয়ারা হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক একটা ব্যাগের দাম হয়তো তার ছয় মাসের মাইনের সমান।
লতিকা ভাজত। ভাজলে পয়সা পাবে। রাতে কসবার বাড়িতে ফিরে এসে তার সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। এক সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে, আরেক সরকার হয়তো প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেউলিয়া করে দেবে। শুধু ফ্যানটাই একভাবে ঘুরে যায়। তার কোনো পরিবর্তন নেই, হেলদোল নেই। স্পিডও চেঞ্জ হয় না। রেগুলেটরটা সেই কবে হারিয়ে গেছে।
তবে যদি ভাবেন আমি এখানে পোভার্টি পর্ন লিখতে বসেছি, খুব ভুল ভাবছেন। লতিকা ঘরে ফিরে ইমতিয়াজ আলির হিরোদের মতো মুষড়ে পড়ে থাকলেও পরক্ষণেই স্নান-টান করে বিছানায় ফোন নিয়ে এসে বসে পড়ত। খাবারের ভিডিও দেখতে তার খুব ভালো লাগে। তুর্কিশ কাবাব। জাপানি রামেন। মার্কিন বার্গার। কোরিয়ান বারবিকিউ। আরও কত কী।
তেল, ধোঁয়া, নুন, মাংস। সভ্যতার ভাষা।
যেটা অনেকেই জানে না... ইনস্টাগ্রামের একটি পেজ FryMeToTheMoon আসলে লতিকার। ৪১১ খানা ফলোয়ার আছে। বেশিরভাগই বট। এবং একাকীত্বে ভোগা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র। লতিকার ক্যাপশনগুলো কিন্তু দেখার মতো।
“ধর্ম নিয়ে ভণ্ডামি? এগ রোলের পরোটায় আমার ভগবান।”
“বিরিয়ানি হলো প্রমাণ, যে র্যাডিকাল বাহিনী সোশ্যাল মিডিয়ায় কমিউনাল হিংসা উগরে আসবে সেই আরসালানেই।”
“রাজনীতি নাকি যুদ্ধ? ভালোবাসার নেই দাম... তেল এখনও গরম, সামনে দাঁড়ালেই ঘাম।”
অদ্ভুতভাবে, লোকের কিন্তু খুব ভালো লাগত। ওই মজা-ঠাট্টা আর তেলের দাগের মাঝে হয়তো কোথাও সিনসিয়ারিটি লুকিয়ে ছিল। হয়তো অনলাইন সততা, কার্যকরী নৈতিকতার থেকেও বিরল।
অবশেষে বুধবার। আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি এল। hue hue কলকাতার বৃষ্টি মামা... নোংরা, জোর, প্রায় বাইবেলিক্যাল। নোয়ার আর্ক পাওয়া না গেলেও যত্রতত্র জোয়ানের আরক পাওয়া যেতেই পারে। একটু রাত হয়ে গেল লতিকার। একটু না... মানে অনেকটাই। ঘড়িতে তখন ১১:৪২।
মধ্যরাতের ভেজা শহর। দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র যেন কোনো বড় দুর্ভোগ থেকে উঠেছে। কিছু মাল এক্সট্রা হয়ে গিয়েছিল, ইনভেন্টরিতে জায়গা ছিল না... তাই লতিকা সেগুলো ভেজে বাকি কর্মচারীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে। নিজেও একটা কাগজের প্যাকেটে কয়েকটা ম্যাকফ্রাইজ নিয়ে এসেছে। সেটাই এক একটা মুখে পুরে হেঁটে যাচ্ছিল বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে।
একটা মোড় ঘুরতেই লোকটাকে দেখতে পেল লতিকা। একটা পান-দোকানের পাশে বসে। পানওয়ালা অবশ্য এই বর্ষার বাজারে কখন দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে গেছে। লোকটির পরনে ধবধবে সাদা জামা। তাই এই ডিস্যাচুরেটেড পরিবেশে বেশ হাইলাইট হয়ে গেছে। জামা একেবারে ভিজে চামড়ার সঙ্গে লেগে গেছে। কলারটা লাল। বেশ চমকপ্রদ লুক তো। দেখে তো বেশ বড়লোক বলেই মনে হচ্ছে।
লতিকা এবং লোকটির চোখাচোখি হয়ে গেল। “এক্সকিউজ মি...” লোকটি কিছুটা ফিসফিস করেই বলে উঠল।
আশেপাশে আর লোকজন বিশেষ নেই। লতিকা দাঁড়িয়ে পড়ল। এ শহরে সিগারেটের চেয়েও বেশি মানুষ মরেছে কিউরিওসিটিতে। লোকটি একটি বাদামি কাগজের প্যাকেট তার দিকে এগিয়ে দিল। ছোটখাটো ঠোঙা জাতীয় প্যাকেট। মিষ্টির দোকানে এক ডজন সিঙাড়া কিনলে যেরকম প্যাকেট দেয় সেরকম। এতেও যেন তেলের দাগ লেগে।
“এটা... এটা আপনি রাখুন।”
“কি?”
“প্লিজ।”
লতিকা কিছু বুঝে ওঠার বা উত্তর দেওয়ার আগেই কোথা থেকে নির্জনতা আর অন্ধকার দুই ভেদ করে সাক্ষাৎ যমদূতের মতো একটা কালো স্করপিও এসে হাজির হল - চকিতে, অকস্মাৎ। বর্ষা ভেদ করে হাই বিম হেডলাইট যেন চোখ পুড়িয়ে দিচ্ছে। মুহূর্তে লোকটির মুখ, তার পরনের জামার মতোই সাদা হয়ে গেল। তার মুখ থেকে শুধু একটা শব্দ বেরোল—
“পালান।”
দুটো পাষণ্ড তখন স্করপিও থেকে নেমে পড়েছে। চেহারা ব্রাজিলিয়ান বাউন্সারদের মতো। লতিকার পা যেন জমে গেছে। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সেই দুই পাষণ্ডের মধ্যে একজন গগনভেদ করে চিৎকার করে উঠল—
“ওই!”
অন্যজন কোমর থেকে কী একটা বার করল... সেটা কী দেখা গেল না, কিন্তু এই অন্ধকারেও সেটার চকচকে ইস্পাত দেখে ভালোই বোঝা গেল। লতিকার কানে তখন জীবদ্দশায় শোনা সব ট্রু-ক্রাইম পডকাস্ট একসঙ্গে বাজতে শুরু করেছে। সেই সাদা জামা এক লাফে লতিকার দিকে এগিয়ে এসে তার হাতে সেই বাদামি প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বলল—
“ওদের এটাকে ভাজতে দেবেন না।”
“হোয়াট দ্য ফ...”
লতিকা কিছু বলে ওঠার আগেই লোকটি দৌড় দিয়েছে অন্য প্রান্তে। এতক্ষণে লতিকা বুঝল লোকটার কলার লাল নয়, ওটা রক্ত! সাদা কাপড়ে শুষে ওরকম দেখাচ্ছে। লোকটি সামনের একটি অন্ধকার গলির মধ্যে মিলিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল... কিন্তু সেই মুক্ত সাদা জামা কি আর তাকে লুকোতে দেয়?
পাষণ্ড দুটিও ধাওয়া করেছে...
মুহূর্তে এই পুরো ঝঞ্ঝাটটা লতিকার সামনে থেকে উবে গেল। লতিকা কী করবে তাই ভাবছে...হঠাৎ আবার গগনভেদ করে একটা আর্তনাদ।
ক্ষণিকের জন্য। মানুষের গলা। তারপর সব আবার নিশ্চুপ।
লতিকা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে তার হৃদপিণ্ডটা একটা ২২ ঘণ্টা ধরে চালিয়ে রাখা জেনারেটরের মতো ধড়ফড় করছে। নিজেকে একটু সামলে নিতেই আরেকটা আওয়াজ কানে এল তার। সেই গলি বেয়ে পায়ের আওয়াজ দ্রুত তার দিকে ধেয়ে আসছে।
লতিকা সেটাই করল যেটা কলকাতা শহর তার নিবাসীদের শিখিয়েছে। সে পালাল। দে দৌড়। কাদা মাড়িয়ে, ঘুমন্ত কুকুরের লেজে পা দিয়ে, ট্রামলাইনে হোঁচট খেয়ে, বুলডোজার মারা চা-দোকানের ভগ্নাংশের পাশ দিয়ে...
কতক্ষণ ছুটেছে লতিকা? নিজেরও খেয়াল নেই।
রাস্তার ধারে এক যুবককে দেখা গেল স্কুটার পার্ক করে ড্রেনের ধারে মনের আনন্দে হিসি করছে। হেলমেটটা স্কুটারের হ্যান্ডেলে ঝুলছিল। হেলমেটের পিছনে লেখা—
“ভালোবাসা... কেন এত অসহায়?”
সিগন্যালটা তখন লাল। পশ্চিমবঙ্গের এই এক গ্রামার। এখানে সিগন্যালে লালের পর ডাইরেক্ট সবুজ আসে। তারপর আসে গেরুয়া।
ছেলেটিকে দেখতে পেয়ে লতিকা ডাক দিল—
“শুনছেন?”
ছেলেটি হকচকিয়ে তার জিনিসপত্র হাতে নিয়েই পিছন ঘুরে তাকাল।
“এই! কে? কে?”
লতিকাকে দেখতে পেয়ে, চূড়ান্ত লজ্জা পেয়ে সে তার মেশিনটি লুকিয়ে তড়িঘড়ি চেন তুলে গ্যারাজ বন্ধ করে দিল। কিছুটা জল তখন তার প্যান্টের ভেতরেও পড়েছে।
লতিকা বলল—
“র্যাপিডো?”
ছেলেটি এবার ভালো করে লতিকাকে আপাদমস্তক দেখে নিল। লতিকার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কেউ তাকে পাঁচ দিন পর ডিপ ফ্রিজ থেকে বার করে মাইক্রোওয়েভে রেখে “ডিফ্রস্ট” প্রেস করতে ভুলে গিয়েছিল।
“না... র্যাপিডো নয়।”
“ওহ, উবার?”
“না।”
“যাত্রী সাথী?”
“না।”
“তাহলে স্কুটার নিয়ে এখানে হিসি করছেন কেন?”
“ইয়ে... মানে, আরে তার সঙ্গে র্যাপিডোর কী সম্পর্ক... ক্ষমতায় না থাকলে কি হিসি করার অধিকার নেই নাকি?”
ছেলেটি একটু কাচুমাচু মুখ করে কিছুক্ষণ লতিকার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
“কিন্তু আপনি... এত রাতে... কোথায় যাবেন? চলুন, ছেড়ে দিয়ে আসছি।”
---
লতিকা ঘরে ঢুকেই দরজাটা এক টানে বন্ধ করে দিল।
তখনও হাঁপাচ্ছে।
প্যাকেটটা রাস্তাতেই ফেলে দিলে হত...
কিন্তু ওই... কৌতূহল।
প্যাকেটটা যেন কীরকম গরম ঠেকছে হাতে। প্রায় যেন জীবন্ত কিছু আছে তাতে।
যাক...
ঘরের হলদেটে টিউবলাইটের আলোয়, টেবিলের ওপর প্যাকেটটা উপুড় করল সে।
ঠক ঠক করে তিনটে জিনিস সেটার ভেতর থেকে পড়ল।
তার মধ্যে একটা জিনিস টেবিলে বাউন্স খেয়ে গড়িয়ে নীচে গিয়ে পড়ল।
লতিকা দেখল টেবিলে পড়ে আছে একটি ছবি ও একটি মেনু কার্ড।
ছবিটা তুলে নিয়ে কেমন ভেজা ভেজা লাগল।
ছবিটা উল্টে তার পেছনে দেখল লাল কালিতে কিছু লেখা।
কালি তখনও কাঁচা, হাতে উঠে আসছে।
কালি অবশ্য নয়...
ছবিটার পেছনে লেখা—
“Chef is Lying”
সিলিং ফ্যানটা সেই আপন মনেই ঘুরে চলেছে।
লতিকা ঝুঁকে পড়ল মাটিতে কী পড়েছে দেখার জন্য।
টেবিলের তলায় উঁকি মারতেই জিনিসটা দেখতে পেল সে।
টকটকে সোনালি।
একেবারে তাজা।
একটি মানুষের ডিপ-ফ্রায়েড আঙুল।
এ কী!
সিলিং ফ্যানের আওয়য়াজটা হঠাৎ এত জোর মনে হচ্ছে কেন?
এত বছর একভাবে চলে, আজকে কী হল তার?
টক।
টক।
টক।
ঠিক তিনটি টোকা পড়ল লতিকার দরজায় সেই মুহূর্তে।
বাইরে থেকে আওয়াজ এল—
“ম্যাডাম... আপনার ফ্রাইজগুলো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”